জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে সিলেটের ইতিহাসে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রথম তরুণ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রবর্তিত ‘সাংবাদিক এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক’-এ ভূষিত হয়েছেন সিলেটের প্রবীণ ও জাঁদরেল সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার। তিনি দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং লন্ডনের জনপ্রিয় গণমাধ্যম 'সুরমা'র সিলেট ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক আবেগঘন আলোচনা সভা ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তাঁর হাতে এই সম্মাননা স্মারক ও অর্থ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ইমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসাইন চৌধুরী ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন।
"তুরাব হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করা হবে"
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, "জুলাই আন্দোলনে শহীদ এটিএম তুরাব আমাদের সবার প্রেরণার উৎস। দেড় হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ এই মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়েছি। তুরাবের রক্ত সিলেটের মাটিতে বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।"
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ১৫ বছর ধরে দেশে অপতথ্যের মাধ্যমে 'তথ্য সন্ত্রাস' চালানো হয়েছিল, তবে বর্তমান সরকারের অধীনে মিডিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তুরাবসহ সব জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলকে সংসদে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
"প্রেস জ্যাকেট পরা অবস্থায়ও তাকে টার্গেট কিলিং করা হয়"
পদকপ্রাপ্তির পর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার বলেন, "সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তুরাব হত্যার ঘটনা সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক। যুদ্ধের ময়দানেও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রেস জ্যাকেট পরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা হয় না। অথচ সেদিন প্রেস জ্যাকেট ও হেলমেট পরা থাকা সত্ত্বেও তুরাবকে টার্গেট করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।"
উল্লেখ্য, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনে অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণে বহুবার মামলার মুখোমুখি হওয়া এই সাহসী সাংবাদিককে সম্মাননা জানাতে পেরে সিলেট প্রেসক্লাব গর্বিত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বিচারহীনতার আশঙ্কায় বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, "আমরা দেখেছি কীভাবে তুরাবের লাশ ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল এবং উল্টো আমাদের লোকদের আসামি করা হয়েছিল। আমরা প্রতিশোধপরায়ণ হতে চাই না, আইনের শাসনের মাধ্যমেই এই হত্যার বিচার চাই।"
অন্যদিকে, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জড়িত পুলিশ কর্মকর্তারা এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় এই তদন্ত প্রক্রিয়া যেন 'সাগর-রুনি' হত্যাকাণ্ডের মতো ধামাচাপা না পড়ে।
তিনি বলেন, "আমরা আর প্রতিবাদ নয়, সরাসরি খুনিদের ফাঁসি চাই।" মহানগর জামায়াতের আমীর ফখরুল ইসলাম মামলার ধীরগতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদরসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসহ সিলেটের বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
ফিরে দেখা: ১৯ জুলাই ২০২৪; যেভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তুরাবের প্রাণ
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, শুক্রবার। জুম্মার নামাজ শেষে সিলেটে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল নগরের বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকা অতিক্রম করছিল। সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 'দৈনিক নয়া দিগন্ত' ও 'দৈনিক জালালাবাদ'-এর নির্ভীক রিপোর্টার এটিএম তুরাব শরীরে স্পষ্ট অক্ষরে 'PRESS' লেখা জ্যাকেট এবং মাথায় হেলমেট পরে সড়কের রেলিং ধরে মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করছিলেন।
ঠিক তখনই এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও ডিসি আজবাহার আলী শেখের নির্দেশে পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এডিসি দস্তগীর একজন কনস্টেবলের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে সরাসরি সাংবাদিক তুরাবকে নিশানা করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে বৃষ্টির মতো গুলিতে বুক ও মাথা ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তুরাব। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ওসমানী মেডিকেল কলেজ এবং পরে সোবহানীঘাট ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে শাহাদাত বরণ করেন এই তরুণ সাংবাদিক। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তে জানা যায়, তুরাবের লিভার, ফুসফুস ও মাথায় “৯৮টি গুলির চিহ্ন” পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রমাণ করে এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত 'টার্গেট কিলিং'।
সহজ হচ্ছে এনআইডি সংশোধন, প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধনে...